National News

মেয়ের মৃত্যুর বিচার চেয়ে বিপাকে সেই দিয়ার বাসচালক বাবা

বাসচাপায় নিজের মেয়ের মৃত্যুর বিচার চেয়ে সতীর্থ পরিবহন শ্রমিকনেতাদের তোপের মুখে পড়েন দূরপাল্লার বাসের চালক জাহাঙ্গীর কবির। এরপরই বাস চালানো ছেড়ে দিয়ে ফুটপাতে চায়ের দোকান শুরু করেন। সেখানেও পরিবহননেতাদের উৎপাত সামলাতে হচ্ছে।

২০১৮ সালের ২৯ জুলাই দুপুরে জাবালে নূর পরিবহনের তিনটি বাসের চালক রেষারেষি করে গাড়ি চালাতে গিয়ে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর বাস তুলে দেন। এতে শহীদ রমিজউদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আবদুল করিম ওরফে রাজীব (১৭) এবং বাসচালক জাহাঙ্গীরের মেয়ে একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী দিয়া খানম ওরফে মীম (১৬) নিহত হন। আহত হন আরও ১২ শিক্ষার্থী।

ওই ঘটনার পর সারা দেশের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজধানীসহ সারা দেশে তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলেন। ওই শিক্ষার্থীদের মেরে-ধরে, মামলা দিয়ে আন্দোলন দমানো হয়। দেশ কাঁপানো সেই আন্দোলনের মুখে সরকার ওই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ সংসদে পাস করে।

মামলা ও সাজা

বাসচাপায় দুজনের মৃত্যুর ঘটনায় দিয়ার বাবা বাসচালক জাহাঙ্গীর কবির অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন। ওই মামলা তদন্তের তদারক করেন ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) উপকমিশনার মশিউর রহমান। তিনি বলেন, আসামিরা জেনে-শুনে শিক্ষার্থীদের চাপা দিয়ে মেরেছে। তাই তাদের সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন হয়েছে। এটা যাতে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে, সে জন্য জাবালে নূর কোম্পানির দুই বাসের মালিক, দুই চালক ও চালকের দুই সহকারীর বিরুদ্ধে অপরাধজনিত প্রাণহানির অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছিল।

মামলায় ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত ২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর জাবালে নূর পরিবহনের দুই বাসের চালক মাসুম বিল্লাহ, জুবায়ের সুমন এবং চালকের সহকারী কাজী আসাদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। দুই চালক এখন কারাগারে। ঘটনার পর থেকে পলাতক হেলপার কাজী আসাদ।

দিয়া ও আবদুল করিমের পরিবার আর্থিক সহায়তা পেলেও মৃত্যুর দুই বছর পরও সেই দুর্ঘটনার ক্ষত কাটিয়ে উঠতে পারেনি পরিবার। মীমের মৃত্যুর পর জাহাঙ্গীর কবিরের আরেকটি মেয়ে হয়েছে। ওই মেয়েরও নাম রাখা হয়েছে মীম। আর ভিটেমাটিহীন করিমের দরিদ্র মা নোয়াখালী গ্রামের বাড়িতে কষ্টে আছেন।

বিপাকে দিয়ার বাবা

জাহাঙ্গীর কবির বলেন, ‘অদক্ষ গাড়িচালকের খামখেয়ালিপনার কারণে আমার মেয়েটাসহ দুজন মারা গেল। তাদের বিচার চেয়েছিলাম। আমি ড্রাইভার হইয়া কেন তাদের বিচার চাইলাম। আমার জন্য দেশে নতুন আইন তৈরি হইছে। গাড়ির মালিক ও শ্রমিকদের সমস্যা হইছে। এখন ভুয়া ড্রাইভার ও জাল লাইসেন্স দিয়ে তারা গাড়ি চালাইতে পারে না। এসব কারণে পরিবহন শ্রমিকনেতারা আমার ওপর ক্ষুব্ধ।’ তিনি বলেন, ‘মেয়ে হারানোর পর সিদ্ধান্ত নিছি জীবনে আর গাড়ির স্টিয়ারিং ধরব না। গাড়ি আর চালাইও না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর কোথাও কাজ পাইনি।’

এখন মহাখালী বাস টার্মিনাল এলাকায় চায়ের দোকান করছেন জাহাঙ্গীর কবির। সেটিও টার্মিনালের পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা বন্ধ করে দিয়েছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, অনেক অনুরোধের পর কিছুদিন হলো দোকানটি আবার চালু করেছেন। শ্রমিক ইউনিয়নে তাঁর সদস্যপদ পরবর্তী সাধারণ সভায় বাতিল করা হবে বলে নেতারা শাসিয়ে গেছেন। নেতারা শ্রমিকদের বোঝাচ্ছেন, তাঁর (জাহাঙ্গীর) জন্য নতুন সড়ক আইন হয়েছে, পরিবহন মালিক ও শ্রমিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

জাহাঙ্গীর কবিরের করা অভিযোগের বিষয়ে গত সোমবার রাতে বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও মহাখালী বাস টার্মিনাল শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যকরী সভাপতি ওসমান আলীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, পরিবহন শ্রমিকনেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। হুমকিধমকি কেউ দিয়ে থাকলে জাহাঙ্গীর যেন শ্রমিক ইউনিয়ন কার্যালয়ে লিখিতভাবে জানান। রেষারেষির কারণে কেউ তাঁকে শ্রমিক সদস্যের পদ বাতিলের কথা বলতে পারেন। জাহাঙ্গীরের ওপর তাঁরও সহানুভূতি আছে বলে দাবি করেন তিনি।

দিয়ার বাবাকে নানা চাপ ও হুমকি দেওয়া প্রসঙ্গে নিরাপদ সড়ক চাইয়ের (নিসচা) চেয়ারম্যান অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘আমাকে পর্যন্ত নানাভাবে হুমকিধমকি ও মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছেন পরিবহন শ্রমিকনেতারা। আর জাহাঙ্গীর তো একজন সাধারণ শ্রমিক। যতক্ষণ পর্যন্ত আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন না হবে, ততক্ষণ এগুলো চলতেই থাকবে। এদের দমানো যাবে না। এরা পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি করছে। পদ ধরে রেখে সরকারের কাছ থেকে সুবিধা লুটছে। আন্দোলন করে আমরা আর কী করতে পারি? সরকার এদের নিয়ন্ত্রণ না করলে এসব বাড়তেই থাকবে।’

জাহাঙ্গীর কবির স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে মহাখালীর দক্ষিণপাড়া মসজিদ গলির একটি টিনশেড বাড়ির ছোট্ট দুটি কক্ষে থাকেন। ওই বাসায় গিয়ে দেখা যায়, দিয়ার টেবিলে বই-খাতা সাজানো-গোছানো। দেয়ালে ঝুলছে তার ছবি। পাশের আলনায় ঝুলছে কলেজের নির্ধারিত সালোয়ার-কামিজ ও পরনের কাপড়চোপড়।

দিয়ার মা রোকসানা বেগম জানান, রেখে যাওয়া স্মৃতির মধ্যেই তিনি এখনো দিয়াকে খুঁজে ফিরছেন। অন্য সন্তানদের চেয়ে ভিন্ন ছিল দিয়া। বাসায় থাকলে তাকে কাজে সহায়তা করত। তার স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা করে বড় হয়ে চাকরি করবে। বাবাকে গাড়ি চালাতে দেবে না। বাবা গাড়ি চালাতে গেলে মেয়ে দুশ্চিন্তায় থাকত। আর সেই গাড়ির নিচে প্রাণ দিতে হলো তাকে।

কষ্টে আছেন করিমের মা

ভিটেমাটি হারা করিমের মা মহিমা বেগম নোয়াখালীর হাতিয়ায় রেহানিয়ায় তাঁর বোনের বাড়িতে থাকেন। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে করিম তৃতীয় ছিলেন। তিনি তাঁর খালাতো ভাইয়ের সঙ্গে ঢাকার আশকোনায় থেকে পড়াশোনা করতেন। করিমের ছোট ভাই আল আমিন ঢাকায় আরেক খালার বাসায় থেকে পড়াশোনা করছে।

মহিমা বেগম বলেন, ‘১৮ বছর আগে স্বামী মারা যান। তখন সন্তানেরা ছোট। বহু কষ্ট করে ওদের বড় করেছি। রাতে ঠিকমতো ঘুম হয় না। তখন করিমের স্মৃতি ভেসে ওঠে, আর ঠিক থাকতে পারি না।’

ছেলে হারানোর পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, আদালত ও কলেজ থেকে পাওয়া ২৬ লাখ টাকা দিয়ে সঞ্চয়পত্র কেনেন মহিমা বেগম। সেগুলোর লাভ দিয়েই এখন নিজে চলছেন, ঢাকায় ছোট ছেলের পড়ার খরচ দিচ্ছেন।

মহিমা বেগম বলেন, করিমের মৃত্যুর পর তৎকালীন একজন মন্ত্রী কত আশ্বাসই তো দিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি কিছুই করেননি।

পাঠকের মতামত:
Show More
Back to top button