Miscellaneous News

ইতালিফেরত ভাইয়ের কথা প্রশাসনকে জানিয়ে ডাক্তার বোনের নজির সৃষ্টি

ডাক্তার বোনের নজির সৃষ্টি- বাংলাদেশেরই একজন সমাজ সচেতন লোকসেবী চিকিৎ সক স্থাপন করলেন অনন্য নজির। তার ইতালি ফেরত আত্মীয় ঢাকারই অভিজাত এলাকার বাসিন্দা হয়েও কোয়ারেন্টাইন মেইনটেইন না করায় তিনি নিজেই স্বত:প্রনোদিত হয়ে প্রশাসনকে ফোন কল করে জানান এবং ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেন সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় পবিত্র দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে।

এই শক্ত মনের দৃঢ় প্রতিজ্ঞ চিকিৎ সক হলেন ডা. ইসরাত শর্মি। তিনি জানান, আমার এই কাজের কা রণে আত্মীয়তার স ম্পর্কে হয়তো ভা’ঙন ধরলো,তবুও আমি আমার সিদ্ধান্তে অনড়। আপনি নিজে এই কাজটা করার মত শক্ত মানসিকতার হতে পারবেন না? অবশ্যই পারবেন। পারতে হবে। এ নিয়ে তিনি এক বক্তব্যে তার নিজ অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। আমরা তার সম্মতি নিয়ে সেই লেখা প্রকাশ করলাম।

ডা. ইসরাত শর্মি’র লেখা

গত রাতে ঘটা আমার নিজ ঘরের একটা সত্য ঘটনা শে য়ার করছি-

আমার আপন ফুপাতো ভাই গত ৯ দিন আগে ইতালি থেকে ফিরেছে দেশে। বাসা ঢাকা শহরের এক অভিজাত এলাকায়।

আমার বাবাকে দেয়া আমার পক্ষ থেকে উপদেশ ছিল এটা দেখভাল করা যে-ফুপা,ফুপু,ফুপাতো ভাই এবং ভাবিসহ ওই ফ্ল্যাটে যারা আছে তারা যেন ১৪ দিন বাসা থেকে বের না হয়/ কোয়ারেন্টাইন মেইনটেইন করে। কিন্তু গতকাল অফিস শেষে গভীর রাতে বাসায় ফিরে খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারলাম ভাইয়া বাজারে গিয়েছিল আজ।

আমি কথাটা শোনা মাত্র আমার বাবাকে বললাম- এখনই থানায় কল দাও,আমি নাম্বার দিচ্ছি। বাবা বললো-থাক বাদ দাও,ভুল করে ফেলেছে।

“থাক বাদ দাও, ভুল করে ফেলেছে”- কথাটা ক্ষমা সুন্দর ভালো মানুষের মত শোনা যাচ্ছে, তাই না???? কিন্তু আমার দৃষ্টিতে নিজের বাবাকে জ ঘন্য অপ রাধী মনে হলো তখন। আমি ওই মুহুর্তেই প্রশাসনকে ফোন কল করে জানালাম। আমার এই কাজের কারনে আত্মীয়তার স ম্পর্কে হয়তো ভাঙন ধরলো, তবুও আমি আমার সিদ্ধান্তে অনড়। আপনি নিজে এই কাজটা করার মত শক্ত মানসিকতার হতে পারবেন না? অবশ্যই পারবেন। পারতে হবে।

এখন থেকে আগামী দুই-তিন সপ্তাহ দেশের জন্য সবচেয়ে বি পজ্জনক সময়। এর মধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থানে সামাজিকভাবে নতুন করো’না ভা ইরাস ছড়িয়ে পড়ার শ ঙ্কা আছে। গতকাল পর্যন্ত যারা আ ক্রান্ত দেশ থেকে এসেছেন তাদের মাধ্যমে ছড়ালেও সর্বোচ্চ আগামী ২১ দিনের মধ্যেই তা প্রকাশ পাবে।

ভাইরোলজির ভাষায় যাকে ‘পিক টাইম’ বলা হয়। এ সময় সং ক্রমিত হতে পারে অ সংখ্য মানুষ। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এমন আশ ঙ্কা করছেন দেশের ভাইরোলজি বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, যেসব দেশে ভা ইরাসটি সামাজিকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে সেই দেশগুলো থেকে আসা যাত্রীদের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনে রাখা হলে এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। তবে এখনও যদি ছ’ড়িয়ে পড়া দেশ থেকে আসা যাত্রীদের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনে আনা হয় তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ আয়ের উন্নত প্রযুক্তির রাষ্ট্রগুলো সব সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও নতুন করো’না ভা ইরাসে মহামা রী ঠেকাতে চ রমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার মূল কা রণ, ওই দেশগুলোর নীতিনির্ধারকরা প্রকৃত পরিস্থিতি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা সময়ের কাজ সময়ে করতে পারেনি। এসব দেশের প্রতিটিতেই ভা ইরাসের সং ক্রমণ শুরু হয়েছিল আ ক্রান্ত দেশ থেকে আসা দু-একজন ব্যক্তির মাধ্যমে।

ভাইরোলজির দৃষ্টিকোণ থেকে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যেসব দেশে ভা ইরাসটির ব্যা পক সং ক্রমণ ঘটেছে সেসব দেশে প্রথম ২ থেকে ৩ সপ্তাহ হাতেগোনা কয়েকজনের দে হে এটি শনাক্ত হয়। একটা পর্যায়ে সেই সংখ্যা আশ ঙ্কাজনকভাবে বাড়তে থাকে।

এর কা রণ, প্রথমে দেশে প্রবেশ করা সেই দু-একজন ব্যক্তি তাদের পরিবার থেকে শুরু করে যত মানুষের সংস্প র্শে গিয়েছেন, তাদের অনেকের দে হেই ভা ইরাস সং ক্রমিত হয়েছে। এই ভা ইরাস সং ক্রমণের লক্ষণগুলো প্রকাশ হতে সাধারণত ১ থেকে ২ সপ্তাহ সময় প্রয়োজন হয়। তাছাড়া সাধারণ সর্দি-কাশি বা ফ্লুর সঙ্গে এর উপসর্গগুলোর মিল থাকায় পরীক্ষা না করে, শুধু শারী রিক লক্ষণ দেখে এটি আলাদা করা সম্ভব হয় না।

এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ভাইরোলজিস্ট এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডি কেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহ বাংলাদেশের জন্য বি পজ্জনক সময়। আমাদের হিসাব মতে, এই সময়ে দেশে নতুন করো’না ভা ইরাসের পিক টাইম হবে।

যা হওয়ার এই সময়ে হয়ে যাবে। তিনি বলেন, যেসব সতর্কতা এখন নেয়া হচ্ছে এগুলো আরও আগেই নেয়া দরকার ছিল। পিক টাইম হলে আরেকটি ডিজাস্টার ঘটবে। সেটা চিকিৎ সক ও সেবাদানকারীদের ক্ষেত্রে। কা রণ তাদের হাতে পর্যাপ্ত পার্সনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট (পিপিই) নেই।

ফলে যারা চিকিৎ সা ও সেবা দেবেন তারা ব্যাপকভাবে ভা ইরাসটি দ্বারা সং ক্রমিত হতে পারেন। অধ্যাপক নজরুল বলেন, আমরা এ ধরনের ঝুঁ কি থেকে অনেকাংশই নিরাপদে থাকতে পারতাম যদি সামাজিকভাবে ছড়িয়ে পড়া দেশগুলো থেকে আসা যাত্রীদের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনে নিতে পারতাম। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রভাবশালীদের জন্য সেটি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

দেশে পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশে কোভিড-১৯ এর প্রথম রো গী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। বর্তমানে সেই সংখ্যা ২০ জন, যাদের মধ্যে মৃ ত্যু হয়েছে ১ জনের। অর্থাৎ ইতালি থেকে আসা ১৪২ জনকে হোম কোয়ারেন্টিনে পাঠিয়ে দেয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই দেশের প্রথম করো’না রো গী শনাক্ত হয়।

এখন পর্যন্ত যে ২০ জন রো গী শনাক্ত হয়েছে তাদের সবাই কোভিড-১৯ এর মহামা রী আ ক্রান্ত দেশ থেকে আসা বা তাদের পরিবারের সদস্য। অথচ শুরুতেই ঝুঁ কিপূর্ণ দেশ থেকে আসা যাত্রীদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোয়ারেন্টিনে রাখলে দেশ মহামা রীর হু মকিতে পড়ত না।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যে দেখা গেছে, গত দুই মাসে সমুদ্র, সড়ক ও আকাশপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন ৬ লাখ ৪৫ হাজার ৭৪২ জন। যাদের বেশির ভাগই কোভিড-১৯ এর মহামা রী চলছে, এমন দেশ থেকে এসেছেন। সতর্কতার জন্য দেশের প্রবেশপথগুলোতে এসব যাত্রীর স্ক্রিনিং করা হয়।

তবে সং ক্রমণের লক্ষণ প্রকাশ পেতে এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগায় স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে যাত্রীদের মধ্যে কেউ যে ভা ইরাসটির বাহক তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে বাহকরা দেশে ফিরে বিভিন্ন মানুষের সংস্প র্শে এসে নিজের অজান্তেই ভা ইরাসটি ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য কোভিড-১৯ এর মহামা রী প্রতি রোধ করার কাজটি দুরূ’হ হয়ে গেলেও অসম্ভব নয়। তবে এর দায়িত্ব নিতে হবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে। একটি অধিদফতর বা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে এ ধরনের বৈশ্বিক মহামা রী (প্যানডেমিক) প্রতি রোধ করা সম্ভব নয়।

এর জন্য দরকার প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ। পাশাপাশি সাধারণ জনগণের সচেতনতা, বেসরকারি খাতের শীর্ষ পর্যায়ের সক্রিয় সহযোগিতা। এই তিন ধরনের মানুষদের সমন্বয় না হলে এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব হয়ে পড়বে।

এ প্রসঙ্গে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডি কেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, দেশের সম্ভাব্য মহামা রী প্রতি রোধে অবিলম্বে^ প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে কোভিড-১৯ এর একটি জাতীয় রেসপন্স টিম গঠন করতে হবে। যার প্রতিটি কার্যক্রম প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে সরাসরি পরিচালিত হবে।

জাতীয় রেসপন্স টিমে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কর্মরত বিশেষজ্ঞদের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে সম্পৃক্ত করে স্বাধীনভাবে মতামত প্রদানের সুযোগ দিতে হবে। সারা দেশে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা সব ব্যক্তিকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে নিতে হবে। জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন আবাসিক হোটেল ভাড়া নিয়ে সেগুলোকে সাময়িক কোয়ারেন্টিন সেন্টারে পরিণত করতে হবে।

প্রয়োজনে শৃঙ্খলা নিশ্চিতে সর্বস্তরে সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করতে হবে। যেসব সরকারি হাস পাতালে চিকিৎ সক, নার্স, টেকনিশিয়ানদের জন্য এখনও পিপিই (পারসন্যাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট) পাঠানো হয়নি, সেখানে দ্রুত সরবরাহ করতে হবে। কোভিড-১৯ নিয়ে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবসহ সব ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের গু জব প্রতিহ তে নজরদারি বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে আ ইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

পাঠকের মতামত:
Back to top button